কেউ কথা রাখেনা

নীহার বিশ্বাস

0

আমরা একে অন্যকে পিঠ দেখাই। কিন্তু মুখ দেখাই না৷ আর এই মুখ না দেখানোর কারণেই অধিকাংশ ভালোবাসা পরিণতি পায়না। ওই পেছন ঘুরে মুখ না দেখার ফলেই অন্যদের মতো রাহুলের প্রেমটাও ভেঙে গেল। চার বছর ধরে যে ছেলেটা মেয়েটাকে ভালোবেসে এসেছে, আজ জানতে পারল সে অন্য একজনকে হৃদয় দিয়ে বসে আছে। তিল তিল করে যে মেয়েটাকে ভালোবাসা নিংড়ে দিয়েছে, বিশ্বাস করেছে আজ রাহুল জানতে পারল সেই প্রিয়া এখন ‘অন্য কারওর সঙ্গে’ ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছে।
বিড়লা প্লানেটারিয়ামের সামনে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই প্রিয়ার হাত থেকে সেদিন ফোনটা আচমকাই কেড়ে নিয়েছিল রাহুল।
– “কি আছে রে তোর ফোনে? গত চার বছর ধরে আমরা প্রেম করছি। দুই বাড়িতে পর্যন্ত জানে। এতো কিছু হল। অথচ আজ পর্যন্ত তুই তোর ফোনটা আমায় দেখতে দিলি না?” এই বলেই প্রিয়ার হাত থেকে হ্যাচকা টানে ফোনটা কেড়ে নিয়েছিল রাহুল। প্রিয়া প্রাণপণে চেষ্ট করেছিল রাহুলের হাত থেকে ফোনটা বাঁচাতে। কিন্তু পারেনি। আর ঠিক তখনই এসএমএসটা আসে প্রিয়ার মোবাইলে। স্ক্রিন লক থাকলেও মোবাইলে ভেসে ওঠে সজলের মেসেজ, “শুয়ে আছো নাকি? আমি কি যাবো?” তারপরেই ঝড়টা আছড়ে পরে। শুরু হয় রাহুল, প্রিয়ার তুমুল ঝগড়া। এক সময় চার বছরের প্রেমটাকে এক লহমায় শেষ করে দিয়ে প্রিয়া বলে
– “আমি তোর সঙ্গে থাকতে চাই না। সজল তোর চেয়ে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসে আমায়। আমিও সজলকে ভালোবাসি।” ‘আমি সজলকে ভালোবাসি’ কথাটা কানে যেতেই মুহূর্তে হতবাক হয়ে পড়ে রাহুল। তারপর বালির বাঁধ ভেঙে গেলে নদীর জল যেমন বিনা বাধায় হুহু করে বইতে থাকে ঠিক সেইভাবে রাহুলের দুই চোখ দিয়ে জলের ধারা বইতে শুরু করে। গলার কাছে কি যেন একটা দলা পাকিয়ে আসছিল। রাস্তার উপরেই বসে পড়ে অস্ফুটে এক মনে শুধু বলে চলেছি, “তাহলে আমার সঙ্গে এতোদিন ধরে নাটক কেন করছিলি? কেন আমার সঙ্গে মিথ্যে প্রেমের অভিনয় করে গেলি? আমার সঙ্গে কেন এমন করলি? আমি কি দোষ করেছিলাম?…” প্রিয়ার হাত ধরে এমন হাজরটা প্রশ্ন করে গেলেও নিরুত্তর ছিল প্রিয়া। হাতটা ছাড়িয়ে পড়ন্ত বিকেল যেমন সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারে মিলিয়ে যায় তেমনি মহানগরীর জনারণ্যে হারিয়ে যায় প্রিয়া।
সম্পর্ক তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। ধীরে ধীরে তিল তিল করে গড়ে ওঠে একটা সম্পর্ক। যেখানে দুইজনের অনেক বোঝাপড়া থাকে। অনেক স্যাক্রিফাইস থাকে। তবেই সম্পর্ক মজবুত হয়। বিশ্বাস হারিয়ে গেলে সম্পর্কও টেকে না। রাহুলের উপর বিরক্ত প্রিয়া সজলের কাছে ‘সুখ’ খুঁজেছিল। তাই এক নিমেষেই চার বছরের সম্পর্কটাকে শেষ করে দিতে পেরেছিল। এদিকে বিচ্ছেদের বিরহে খানিকটা পাগলের মতো দশা রাহুলের। তিনটা মাস লেগেছিল প্রিয়ার ছেড়ে যাওয়ার শোক কাটিয়ে উঠতে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের কাজে ডুবে গিয়ে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে আবার পুরনো ছন্দে ফিরে যায় রাহুল। কিন্তু মাঝেমধ্যে যখন একলা ঘরে আলো নিভিয়ে চোখ বন্ধ করে রাহুল, তখন তার দুই চোখে কাজল পড়া প্রিয়ার কালো চোখ জোড়াই ভেসে ওঠে। তখন অনেক কথাই মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে নির্জন রাস্তার ধারের বট গাছের নীচে কাটানো সময়, পয়লা বৈশাখে নিয়ম করে ঘুরতে বেরিয়ে চুমু খাওয়া, ছুটির দিনে বিকেল বেলায় বাইক রাইড। শহরের ইতিউতি ঘুরে বেড়ানো…আরও অনেক অনেক অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কথা। তাকে ঠকালেও আজও সে সত্যিই প্রিয়াকে ভালোবাসে। এইভাবেই অফিসের কাজ আর লেখালেখি নিয়েই কাটিয়ে দিচ্ছিল রাহুল।
কথায় আছে, অদৃষ্টের লিখন যায়না খণ্ডন। সজল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এবার বিসিএস পাশ করলেই প্রিয়াকে বিয়ে করবে। প্রিয়াও বাড়িতে বলে সজলের বিসিএসের জন্য এক বছর অপেক্ষা করল। সজল খুবই ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র, তাই বিসিএস পাশও করল। জয়েন্ট বিডিও হিসেবে ময়নাগুড়িতে কাজে যোগ দিল। সজলের বিসিএস পাশ করায় যতনা সজল খুশি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল প্রিয়া। কিন্তু ওই যে অদৃষ্টের লিখন!! ময়নাগুড়িতে গিয়ে কর্মজীবন শুরু করার সময়েই সজলের সঙ্গে পরিচয় হয় জেলার এক পঞ্চায়েত আধিকারিক কোয়েল বসুর সঙ্গে। স্মার্ট, সুশ্রী, শিক্ষিতা, অল্প বয়সী কোয়েলকে দেখে সজলের হৃদয়ে নতুন করে বসন্তের কোকিল ডেকে ওঠে। প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর আদানপ্রদান, তারপর ফোন নম্বর, তারপর রাতে টুকটাক কথা থেকে তিন মাসের মধ্যেই প্রেম একেবারে ফেবিকুইক আঠার মতো জমে যায়। এদিকে প্রিয়া দিনে যতবার সজলকে ফোন করে ততবারই সজলের ফোন ব্যস্ত পায়। আগের মতো আর চার্ম পায়না প্রিয়ার কথায়। ফলে প্রিয়ার উপরে কারণে, অকারণে বিরক্ত প্রকাশ করতে থাকে সজল। একদিন সজল ফোন ধরতেই প্রিয়া বলে ওঠে
-“কি ব্যাপার, তোমার ফোন সব সময় ব্যস্ত থাকে কেন?” কিছুটা চড়া সুরেই প্রিয়া বলে
-“তুমি কি আমায় এড়িয়ে অন্য কারও সঙ্গে কথা বলো?”
-“আরে নানা, বোঝই তো নতুন চাকরি। কাজের খুবই প্রেশার। বড় সাহেবদের ফোন আসতেই থাকে।” সজল কিছুটা মেক আপ দেওয়ার চেষ্টা করে।
-“আমি কি কিছুই বুঝিনা? তুমি কবে বিয়ে করবে তারাতাড়ি বলো। আমাদের এবার দুই বাড়িতে কথা বলে বিয়ে ঠিক করা উচিত।”
বিয়ের কথা শুনে সজল কিছুটা গম্ভীর হয়েই বলে
-“এখনই আমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব নয়। আমায় এক বছর প্রবেশনে থাকতে হবে। আগে ক্যারিয়ার। তারপর অন্য কিছু। তোমার তাড়া থাকলে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারো।”
-“অন্য কাউকে মানে??? তুমি কি বলছ? আমি তোমার জন্য এতো বছর অপেক্ষা করলাম, এখন তুমি বলছ অন্য কাউকে বিয়ে করতে!!!” দৃশ্যত হতবাক প্রিয়া। অবশেষে কোয়েলের কথা বলেই ফেলল সজল। রাখাঢাক না করে শেষমেশ সজল বলে
– “আমার সঙ্গে তোমার স্ট্যাটাস যায় না। আমি আরও বেটার ডিজার্ভ করি। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড। আর আমার মা, বাবাও তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মানতে চাইছে না। আমি আমার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে যেতে পারবনা।”
বাজ পড়লে তালগাছের সমস্ত পাতা পুড়ে গাছটা যেমন প্রাণহীন ভস্মীভূত পোড়া কাঠির রূপ নেয়, তেমনি সম্পর্ক ভাঙার কথা শুনে নিস্তেজ পাথরের মূর্তির মতো হয়ে পরে প্রিয়া। দ্বিতীয়বার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার অনুরোধ করার জোরটাই হারিয়ে ফেলে সে। ঠিক সেই সময় প্রিয়ার মনে পড়ে দেড় বছর আগে রাহুলের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার দিনে তার বলা কথাগুলি। আজ প্রিয়ার গলার কাছেও দলা পাকিয়ে আসছিল কান্নাটা। কিন্তু কাঁদতে পারছিল না। কাকে কিভাবে যে তার দুঃখটা বোঝাবে সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলনা সে। শুধু ভাবল, দেড় বছর আগে মরিচীকার পেছনে না ছুটে একটু পেছন ফিরে যদি দেখতাম তাহলে ভালোবাসার মানুষটিকেই খুঁজে পেতাম। শেষ বয়সে এসে আর হৃদয় ভাঙত না।

Leave A Reply

Your email address will not be published.