আমরা করবো জয়

পারমিতা রায়

0

Indian cricket বলতে আমার কাছে এখনো 90s এর স্বর্ণযুগ। সচিন-সৌরভ-যুবরাজ-জাদেজা- কাম্বলি, শ্রীনাথ-কুম্বলে-হরভজন, আর অবশ্যই দ্রাবিড় (এটা ভীষণ স্পেশাল)। এই পরিবার রিটায়ার করার পর আমারও কেমন যেন ডিভোর্স হয়ে গেলো খেলাটার সাথে। নতুনদের প্রায় চিনি না বললেই চলে। আজ অনেকদিন পর সেই মন কেমন করা ম্যাচ গুলোর কথা মনে পড়ছে।
ভারতের সামনে বিশাল টার্গেট ফেলেছে প্রতিপক্ষ। দ্বিতীয় হাফে ভারতের ইনিংস। টান টান উত্তেজনা… কি হয় কি হয়। ওপেনিং জুটির ওপর অনেক ভরসা। উত্তেজনায় ঘরের গুঞ্জন কমছে না। সেই সাথে ফুল ভলিউমে স্টেডিয়ামের গর্জন আর কমেন্ট্রি। অভিজ্ঞরা বলছেন “ধরে খেলো বাবা”। বেশী ধরে খেললে বলছেন “বল নষ্ট করছে কেন ! অনেক টার্গেট, পিটোতে হবে, শুধু নিজের রেকর্ড বাড়ালে হবে ! দলের কথাও তো ভাবতে হবে !”
কিন্তু হতাশ করলেন মহারথীরা। প্রত্যাশার অনেক আগেই হাত তুলে ফেললেন। স্টেডিয়ামের কিছু হতবাক চাহনি, আর ঘরে বয়োজ্যেষ্ঠদের পায়চারি। তার সাথে তির্যক মন্তব্য। কোথায় লাগে আৰ্চেকার ! যেন পিচে একবার ছেড়ে দিলেই হয়। প্রতিটি বলে ছক্কা মারা কাকে বলে এনারা হাতে ধরে শিখিয়ে দেবেন। খেলা যতই এগোয় উত্তেজনা ততই বাড়ে। ধুম ধাড়াক্কা ছক্কা আর বাউন্ডারি মেরে ম্যাচ খানিক জমিয়ে দিয়ে যুবরাজ যখন কুপোকাত হলেন তখন লম্বা দীর্ঘশ্বাস! এবার মাঠে নামলেন আমার বরাবরের ক্রাশ, মিস্টার ডিপেন্ডেবল, দ্রাবিড়। ভাঙা পাঁচিল একটু একটু করে গড়ে তুললেন নিজের অবিচল ধৈর্য্য আর স্থিরতা দিয়ে। সংকট ছাড়িয়ে অনেকটা এগিয়ে দিলেন দলকে। মিডল অর্ডার শেষ। এবার বোলারদের পালা। এখনো চার ওভারে ত্রিশ রান। বড়রা কোকিয়ে উঠলেন, “বাছা একটা দুটো করে রান নাও, কোনো তাড়া নেই”। কে কার কথা শোনে! সবাই যুবি হতে চায়। হুড়মুড় করে পড়ছে ভারতীয় পাঁচিল। বোলার রা যেন বল দেখতেই পাচ্ছে না। হাওয়ায় হুস হাস ব্যাট ঘোরাচ্ছে। পর পর ক্যাচ। বল কমছে, রান দাঁড়িয়ে। আমরাও দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ কক্ষ ত্যাগ করে বারান্দায় ঘূর্ণায়মান। মা মাসিমারা বোঝাচ্ছেন খেলায় তো হার জীত লেগেই থাকে! তার জন্যে হার্ট ফেল করবে নাকি !! আমার মন খারাপ দ্রাবিড়ের এতো কষ্টের ফল তুলতে পারলো না দল। আমার এতো কষ্ট হলে না জানি “ওঁর” কত হচ্ছে!
এক ওভারে দশ রান। যারা কক্ষচ্যুত হয়েছিলেন পাক খেতে খেতে মাঝেমাঝেই চলে আসছেন কক্ষে। আড়াল থেকে উঁকি মারছেন, যেন দেখার আর কিস্যু নেই, যা হওয়ার হয়ে গেছে, তবু যদি ফস্কে কিছু গোলে যায়…. !
এক বল চার রান। মাঠে সৈন্যরা মুখিয়ে আছেন। পিচে নার্ভাস হাতে ব্যাট ঘোরাচ্ছেন টেইল এন্ডার।
মরিয়া চাহনি। স্টেডিয়ামে মিশ্র শোরগোল। ঘরে উত্তেজনার চরমতম মুহূর্ত। বল পড়লো… ব্যাটসম্যান ব্যাট ঘোরালেন সপাটে… বল অনেকটা ছিটকে গিয়ে বাউন্ডারির দিকে ছুটলো মাটি কামড়ে… তিনদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ফিল্ডার… বল ছুটছে ফাঁক গোলে… গতি কমে যাচ্ছে ক্রমশ…. পারলো না ওরা… পারলো নাআআআ…. ঈশ্বর যেন অলক্ষ্যে বসে বল ঠেলে দিলেন বাউন্ডারির বাইরে। আলতো ভাবে বাউন্ডারি ছুঁলো বল…. ধরাশায়ী ফিল্ডার! স্টেডিয়াম ফেটে পড়লো উল্লাসে। সমুদ্রের গর্জন হার মানলো। আর এদিকে প্রতিটি বাড়ি থেকে গগনবিদারী চিৎকার…হোওওওওও…. ঘরের ভেতরে তখন এক লাফে সিলিং ছুঁলাম আমরা। চোখে আনন্দাশ্রু, উত্তেজনা প্রশমনে নেচে নেচে থালা বাটি বাজানো শুরু হলো। কারা যেন পটকা হাতে নিয়েই বসে থাকতো। দুম দাম আওয়াজ চারিদিকে… সেকি আনন্দ ! সেকি বিজয় !

আজ কেন মনে পড়ছে জানেন ? আজ যেন আবারও তেমন একটা সময়। ভারতের হাতে বল একুশটা, টার্গেট একশো তিরিশ কোটি। অনেক বড় টার্গেট। রান রেট কমতে দিলে চলবে না। নজরে থাকবে প্রতিটি বল।
আমরা হিমশিম খাবো, লোক হাসাবো, রান আউট, ক্যাচ আউট, স্ট্যাম্প আউট হবো একের পর এক। মাঝ জোয়ারে ডুবু ডুবু হবে নৌকা। ভেঙে পড়বে ধৈয্যের পাঁচিল। ভয়ে হৃদরোগ হবে অনেকের। কিন্তু শেষটা ঠিক পারবো। ঈশ্বর বল ঠেলে দেবেনই বাউন্ডারির বাইরে। আমরা জিতবোই !!
তবে একা মহারথীরা পারবেন না, এগিয়ে আসতে হবে আমাদের মতো টেইল এন্ডারদের। সকলের মরিয়া চেষ্টায় আমরা ঠিক পার হয়ে যাবো বাউন্ডারি। ঈশ্বরে ভরসা রাখুন। আমরা ভারতবর্ষ, আস্থা আর অলৌকিকের দেশ…
WE SHALL OVERCOME !

Leave A Reply

Your email address will not be published.